চিংড়ি শিল্পে করোনার থাবা

প্রকাশিত: ১১:১৩ পূর্বাহ্ন, মে ৭, ২০২০

বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের কারণে সাদা সোনাখ্যাত বাগদা চিংড়ি শিল্পে বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। বহির্বিশ্বে একের পর এক ক্রয়াদেশ বাতিলের কারণে খামার থেকে চিংড়ি কেনা বন্ধ করে দিয়েছে মাছ কোম্পানিগুলো। এর প্রভাবে বাজারে চিংড়ির দাম অস্বাভাবিকভাবে কমে গেছে।

হিমায়িত খাদ্য রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো জানিয়েছে, চিংড়ির প্রধান ক্রেতা আমেরিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন রাষ্ট্র। করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের পর এসব আন্তর্জাতিক ক্রেতারা বহু ক্রয়াদেশ বাতিল করেছে। ফলে খামার থেকে সংগ্রহ করা প্রায় হাজার কোটি মূল্যের চিংড়ি কোল্ড স্টোরে পড়ে রয়েছে। নতুন করে হ্যাচারি থেকে চিংড়ি সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে না।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ফ্রজেন ফুড এক্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি গাজী বেলায়েত হোসেন বলেন, আমাদের বিভিন্ন মাছ কোম্পানির প্রায় ২৯০টি আন্তর্জাতিক চুক্তি বাতিল হয়েছে। ফলে ওই মাছগুলো হ্যান্ডওভার করা সম্ভব হয়নি। তাছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে চিংড়ির দাম করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের পর প্রায় এক ডলার কমেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে বাগদা চিংড়ির যে মূল্য চলছে, সেই দামে মাছ রপ্তানি করা সম্ভব নয়।

আন্তর্জাতিক বাজারে চিংড়ি শিল্পের দুরবস্থার প্রভাব পড়েছে প্রান্তিক পর্যায়ে। উৎপাদন খরচের চেয়ে কম মূল্যে বিক্রি করার কারণে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে বাগদার চিংড়ির ঘের মালিকরা। করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের পূর্বের তুলনায় বর্তমানে হাট-বাজারে প্রতিকেজি বাগদা চিংড়ির দাম চার থেকে পাঁচশ টাকা কমে গেছে। লোকসানের কারণে চাষিরা জামানত হারাতে বসেছেন।

১৯৬০ সালের দিকে উপকূলীয় বাঁধ দিয়ে নদীর লোনা পানি আটকে শুরু হয় বাণিজ্যিক চিংড়ি ঘের বা খামার। সাধারণত প্রতিবছর জানুয়ারি থেকে মার্চ মাসের মধ্যেই চিংড়ি ঘেরে মাছের পোনা ছাড়া হয়। তিন মাসের ভিতরে সেগুলো বিক্রয়যোগ্য হয়ে ওঠে। বড় ঘের বা খামারগুলোতে প্রতিমাসেই পোনা ছাড়া হয়। প্রথমবার পোনা ছাড়ার তিনমাস পর থেকেই প্রায় প্রতিদিনই চিংড়ি আহরণ করা যায়। তবে পূর্ণিমা ও অমাবস্যা গৌণ চলাকালীন চিংড়ি আহরণের পরিমাণ বেশি হয়।

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের খুলনা সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটে এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের কক্সবাজারে চিংড়ি চাষ বেশি হয়। ঘের মালিকরা স্থানীয় আড়ৎগুলোতে চিংড়ি সরবরাহ করে। আর হিমায়িত খাদ্য রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো স্থানীয় মৎস্য আড়তদারদের কাছ থেকে বাগদা অথবা গলদা চিংড়ি সংগ্রহ করে প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে সেটি বিদেশে রপ্তানি করে থাকে।

করোনা ভাইরাস প্রাদুর্ভাবের কারণে চিংড়ি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো আড়ৎগুলো থেকে চিংড়ি সংগ্রহ বন্ধ করে দেয়। এরফলে পাইকারি বাজারে মাছের দরপতন হয়। সেই প্রভাব গিয়ে পড়ে ঘের ব্যবসায়ীদের উপর। সর্বশেষ পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ীরা নিজেদের খামারে যে টাকা বিনিয়োগ করেছেন সেই পরিমাণ টাকার চিংড়ি বিক্রি নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছেন।

চিংড়ির আড়তদাররা বলছেন, চাহিদা কমার কারণে দাম কমেছে। ফলে ঘের ব্যবসায়ীরা চিংড়ি ওঠানো কমিয়ে দিয়েছেন। সাতক্ষীরা শ্যামনগরের একটি মৎস আড়ৎ বিসমিল্লাহ এন্টারপ্রাইজ। এটির মালিক আব্দুল জলিল বাংলাদেশ জার্নালকে বলেন, টপ গ্রেডের চিংড়ি সাড়ে চারশ থেকে পাঁচশ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। যা থেকে ৪-৫ মাস আগেও সাড়ে আটশ থেকে হাজার টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। এরকম চলতে থাকলে ব্যবসা করা দায় হয়ে পড়বে।

খুলনার পাইকগাছার ঘের ব্যবসায়ী আনিসুর আজাদ বলেন, চলতি বছর আমার ৩০ বিঘার ঘেরে এর মধ্যে প্রায় ১০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে। এরইমধ্যে চিংড়ি ওঠা শুরু করেছে। তবে যে দামে চিংড়ি বিক্রি হচ্ছে ওই দাম চলতে থাকলে আমার জামানত হারাতে হবে। এমন পরিস্থিতিতে সহজ শর্তে প্রণোদনা দিলে প্রান্তিক পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের কিছুটা উপকার হবে।

এদিকে মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছে, প্রান্তিক চাষিদের সহযোগিতার জন্য ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রস্তুতি চলছে। তালিকা অনুযায়ী প্রণোদনা দেয়া হবে। কয়রা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. আলাউদ্দীন হোসেন জানান, ক্ষতিগ্রস্ত মৎস্য চাষিদের তালিকা প্রস্তুতের নির্দেশনা পেয়েছি। সে লক্ষ্যে এরই মধ্যে কাজ শুরু করা হয়েছে।